টাইফয়েড

টাইফয়েড জ্বরের কারণ, প্রতিকার ও চিকিৎসা

টাইফয়েড জ্বর হলো ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সৃষ্ট একটি রোগ। সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া টাইফয়েড জ্বরের কারণ। দ্রুত এই রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা করানো না হলে মারাত্মক ক্ষতি ঘটতে পারে।টাইফয়েড এর জীবাণু ছড়ায় সাধারণত অনিরাপদ পানি ও অস্বাস্থ্যকর বা দূষিত খাবারের কারণে। সচেতন থাকলে এর সংক্রমণ সহজেই এড়ানো সম্ভব। এতে সঠিক সময়ে আপনি টাইফয়েড শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করতে পারবেন।

চলুন জেনে নেয়া যাক টাইফয়েড জ্বরের কারণ কি হতে পারে, প্রতিকার কিভাবে করা যায় এবং চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো সম্পর্কে।

০১.টাইফয়েড জ্বরের কারণ ও ছড়ানোর মাধ্যম

পানিবাহিত রোগের মধ্যে টাইফয়েড কে একটি মারাত্মক রোগ হিসেবে ধরা হয় যা আমাদের দেহে সাধারণত দুই ধরনের জীবাণুর সংক্রমণে হয়ে থাকে।

(১) সালমোনেলা টাইফি এবং
(২) সালমোনেলা প্যারাটাইফি

যে জ্বর সালমোনেলা টাইফি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণে হয় তাকে টাইফয়েড জ্বর বা এন্টারিক ফিভার বলে। আর যদি এ জ্বর সালমোনেলা প্যারাটাইফি নামক জীবাণুর কারণে হয় তখন তাকে প্যারা টাইফয়েড জ্বর বলে। শরীরে এই জীবাণু প্রবেশ করে প্রধানত দূষিত পানি ও খাবার গ্রহণের মাধ্যমেই। তাছাড়া পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি উদাসীনতার কারণেও এটি শরীরে প্রবেশ করতে পারে। টাইফয়েড জ্বর হতে আরোগ্য লাভ করেছেন কিন্তু এই ব্যাকটেরিয়া বহন করছেন এমন কিছু সংখ্যক ব্যক্তিও এই রোগের বাহক হতে পারে বলে মনে করা হয়। যেভাবেই এই জীবাণু শরীরে প্রবেশ করুক তা শরীরে প্রবেশের পর বৃহদান্ত্রকে আক্রমণ করে। এছাড়া মানব শরীরের পিত্তথলিতে সাধারণত এই ব্যাকটেরিয়া জমা থাকে এবং উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়ার সাথে সাথে এটি দ্রুত গতিতে শরীরে আক্রমণ করে থাকে।

০২.টাইফয়েড এর ঝুঁকি কাদের বেশি?

টাইফয়েড সাধারণত যেকোন বয়সেই হতে পারে, তবে শিশুদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। শরীরে জীবাণু প্রবেশ করলেই টাইফয়েড হয়ে যাবে এমন কোন কথা নেই কারণ দেহে যদি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ভালো থাকে তাহলে অনেক সময়ই জীবাণু দেহে সংক্রমণ করতে পারেনা। তবে কম রোগপ্রতিরোধক্ষমতা সম্পন্ন ব্যক্তি যেমন এইচআইভি পজিটিভ ও এইডস আক্রান্ত রোগীরা সহজেই টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে।সাধারণত একটি দেশের যেসব এলাকায় এ ধরনের রোগের প্রাদুর্ভাব বেশি বলে চিন্তা করা হয় সেসব জায়গায় কেউ যদি ভ্রমণ করে তাহলে তার এ রোগের জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।

০৩.কিভাবে টাইফয়েড জ্বর সনাক্তকরণ করা হয়?

টাইফয়েড জ্বর হয়েছে কিনা কারও তা শুধুমাত্র পরীক্ষা নিরীক্ষার পর চিকিৎসকগণ বলতে পারবেন ।

  • রক্তের কালচার: এটি টাইফয়েড জ্বর নির্ণয়ের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। স্যালমোনেলা টাইফির (যে ব্যাকটেরিয়া রোগটি ঘটায়) উপস্থিতি সনাক্ত করতে রোগীর রক্তের একটি নমুনা নেওয়া হয় এবং ব্লাড কালচার (রক্ত পরীক্ষা) করা হয় ।যদি নমুনায় স্যালমোনেলা নামক ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায় তাহলে প্রকার ভেদে এটিকে টাইফয়েড ও প্যারা টাইফয়েড এ পার্থক্য করা হয়।
  • ওয়াইডাল পরীক্ষা: এটি একটি রক্ত ​​পরীক্ষা যা রোগীর রক্তে সালমোনেলা টাইফির অ্যান্টিবডি সনাক্ত করে। এই পরীক্ষাটি এমন এলাকায় ব্যবহার করা হয় যেখানে ব্লাড কালচার সুবিধা নেই। এটি এক ধরনের ননস্পেসিফিক ব্লাড টেস্ট যা টাইফয়েড জ্বর হওয়ার ২য় সপ্তাহে করতে হয় ।
  • মল কালচার: কিছু কিছু ক্ষেত্রে, সালমোনেলা টাইফির উপস্থিতি শনাক্ত করার জন্য রোগীর মলের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এই পদ্ধতিটি এমন ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারে যেখানে রক্তের কালচার নেতিবাচক, তবে টাইফয়েড জ্বরের ক্লিনিকাল সন্দেহ বেশি।
  • ইমেজিং স্টাডিজ: ইমেজিং স্টাডি যেমন এক্স-রে, আল্ট্রাসাউন্ড এবং সিটি স্ক্যানগুলি টাইফয়েড জ্বরের জটিলতা যেমন অন্ত্রের ছিদ্র, ফোড়া বা বর্ধিত প্লীহা সনাক্ত করতে ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • চিকিৎসা এবং ভ্রমণের ইতিহাস: আপনার স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী আপনার লক্ষণ এবং আপনার চিকিৎসা এবং ভ্রমণের ইতিহাসের উপর ভিত্তি করে টাইফয়েড জ্বর সন্দেহ করতে পারে। আপনার শরীরের তরল বা টিস্যুর নমুনায় সালমোনেলা এন্টারিকা সেরোটাইপ টাইফি বৃদ্ধির মাধ্যমে রোগ নির্ণয় প্রায়ই নিশ্চিত করা হয়।
  • শরীরের তরল বা টিস্যু কালচার: আপনার রক্ত, মল, প্রস্রাব বা অস্থি মজ্জার নমুনা ব্যবহার করা হয়। নমুনাটি এমন একটি পরিবেশে স্থাপন করা হয় যেখানে ব্যাকটেরিয়া সহজেই বৃদ্ধি পায়। টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি একটি অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মাধ্যমে পর্যবেক্ষন করা হয় যাকে কালচার টেস্ট বলে । একটি অস্থি মজ্জা কালচার প্রায়ই সালমোনেলা টাইফির জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল পরীক্ষা।

কিন্তু টাইফয়েড জ্বর নিশ্চিত করতে অন্যান্য পরীক্ষা ব্যবহার করা যেতে পারে। একটি হল আপনার রক্তে টাইফয়েড ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবডি সনাক্ত করার জন্য পরীক্ষা। আরেকটি টেস্ট রক্তে টাইফয়েড ডিএনএ পরীক্ষা করে।

টাইফয়েড জ্বরের কারণ, চিকিৎসা

০৪.টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসা পদ্ধতি

অ্যান্টিবায়োটিক থেরাপি হল টাইফয়েড জ্বরের একমাত্র কার্যকর চিকিৎসা। নির্দিষ্ট এন্টিবায়োটিক শুরুর পরও জ্বর কমতে কখনও চার পাঁচদিন লেগে যেতে পারে। টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর যদি কারও দ্রুত চিকিৎসা করা না হয় তাহলে এ জ্বর শরীরে সপ্তাহ অথবা মাসব্যাপী থাকতে পারে। 

সাধারণত নির্ধারিত অ্যান্টিবায়োটিক

টাইফয়েড জ্বরের চিকিৎসার জন্য আপনি যে ওষুধটি নিবেন তা নির্ভর করে আপনি কোথা থেকে  ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে আক্রান্ত হয়েছেন তার উপর। বিভিন্ন জায়গায় তোলা স্ট্রেনগুলি নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের জন্য ভাল বা খারাপ প্রতিক্রিয়া জানায়। এই ওষুধগুলি একটি বা একসাথে ব্যবহার করা যেতে পারে। টাইফয়েড জ্বরের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া যেতে পারে:

১.ফ্লুরোকুইনোলোনস : এই ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক , সিপ্রোফ্লক্সাসিন (সিপ্রো) সহ অ্যান্টিবায়োটিকগুলি কে প্রথম চিকিৎসা ঔষধ হিসেবে ধরা হয় । তারা ব্যাকটেরিয়াকে নিজেদের কপি করা থেকে বিরত রাখে। কিন্তু কিছু ব্যাকটেরিয়ার কিছু স্ট্রেন চিকিৎসার পরও বাঁচতে পারে। এই ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী।

২. সেফালোস্পোরিন : অ্যান্টিবায়োটিকের এই গ্রুপটি ব্যাকটেরিয়াকে কোষের প্রাচীর তৈরি করতে বাধা দেয়। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে, এক ধরনের সেফট্রিয়াক্সোন ব্যবহার করা হয়।

৩.ম্যাক্রোলাইডস : অ্যান্টিবায়োটিকের এই গ্রুপটি ব্যাকটেরিয়াকে প্রোটিন তৈরি করতে বাধা দেয়। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকলে, অ্যাজিথ্রোমাইসিন (জিথ্রোম্যাক্স) নামক এক ধরনের ঔষধ  ব্যবহার করা যেতে পারে।

৪.কার্বাপেনেমস : এই অ্যান্টিবায়োটিকগুলি ব্যাকটেরিয়াকে কোষের প্রাচীর তৈরি করতে বাধা দেয়। কিন্তু তারা সেফালোস্পোরিন যে পর্যায় এর প্রক্রিয়ায় ফোকাস করে তার থেকে একটি ভিন্ন পর্যায়ে ফোকাস করে। এই শ্রেণীর অ্যান্টিবায়োটিকগুলি খুবই গুরুতর রোগের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যেতে পারে যা অন্যান্য অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতি সাড়া দেয় না।

অন্যান্য চিকিৎসা 

  • তরল পানীয়- এটি দীর্ঘ সময় ধরে জ্বর এবং ডায়রিয়ার কারণে সৃষ্ট ডিহাইড্রেশন (শরীরে পানি স্বল্পতা) প্রতিরোধে সহায়তা করে। আপনি যদি খুব ডিহাইড্রেটেড হন তবে আপনাকে শিরার মাধ্যমে তরলজাতীয় খাবার গ্রহণ করতে হতে পারে।
  • সার্জারি- অন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে, তা ঠিক করার জন্য আপনার অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে
  • টাইফয়েড আক্রান্ত রোগীকে পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। যদি জ্বর বেশি থাকে তাহলে পুরো শরীর ভেজা গামছা বা তোয়ালে দিয়ে মুছে দিতে হবে। অসুস্থতাকালীন সময়ে উচ্চ ক্যালরি সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা উচিত। 
  • প্রতিবার বাথরুম ব্যবহারের পর পানি ও সাবান দিয়ে হাত ভাল করে ধুয়ে ফেলতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ বিষয় হলো যতদিন পর্যন্ত চিকিৎসক এন্টিবায়োটিক গ্রহণের পরামর্শ দিবেন ঠিক ততদিন পর্যন্ত তা গ্রহণ করতে হবে।
০৫.টাইফয়েড জ্বর প্রতিরোধে করণীয় 

টাইফয়েড জ্বরের জন্য নির্ধারিত ভ্যাক্সিন বা টিকা গ্রহণ করা রোগটি থেকে বেঁচে থাকার একটি উপায় (অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী) । মুখে খাওয়ার  এবং ইনজেকশন উভয় ধরনের ভ্যাক্সিন বাজারে পাওয়া যায়। সব সময়  ভ্যাক্সিন ১০০% কার্যকর হয়না তাই ভ্যাক্সিনের পাশাপাশি নিম্নলিখিত পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করা উচিত 

  • শাকসবজি, ফলমূল এবং রান্নার সামগ্রি সবসময় পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নিতে হবে
  • পর্যাপ্ত পরিমাণে ফুটানো বা পরিশোধিত পানি সংরক্ষণ করতে হবে এবং পানি যাতে দূষিত হতে না পারে সেজন্য ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংরক্ষণকৃত সেই পানি পান করা উচিত
  • খাবার ভালভাবে রান্না অথবা সিদ্ধ করে খাওয়া উচিত
  • খাবার গ্রহণ বা খাবার প্রস্তুত অথবা পরিবেশনের পূর্বে খুব ভালভাবে হাত ধুয়ে নেয়াটা খুবি জরুরী
  •  বরফ তৈরি করা বা সেই বরফ মিশিয়ে কোনো পানীয় পান করা থেকে বিরত থাকতে হবে যদিনা সেটি বোতলজাত বা পরিশোধিত পানি হয়
  • টয়লেট সব সময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে
  • টয়লেট ব্যবহারের পর, শিশুকে পরিষ্কার করার পূর্বে ও পরে , খাবার প্রস্তুত বা পরিবেশন করার পূর্বে, নিজে বা শিশুকে খাওয়ানোর পূর্বে সাবান দিয়ে ভালভাবে হাত পরিষ্কার করতে হবে।

পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাই হলো টাইফয়েড জ্বর  থেকে বাঁচার মূলমন্ত্র। যারা নিয়মিত ভ্রমণ করে থাকেন তাদের প্রায়ই বিভিন্ন জায়গায় খেতে হয়। এসব এলাকায় বিশুদ্ধ পানি পান এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার সবসময় নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না যার ফলে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই টাইফয়েড প্রবণ এলাকা পরিদর্শন করলে বাইরের খাবার খাওয়া এবং পানি পান করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। 

০৬.চিকিৎসকের প্রশ্ন উত্তর পরামর্শ 

আপনার চিকিৎসা প্রদানকারী আপনাকে অনেক প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করতে পারে। তাদের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকার ফলে আপনি যে কোনও পয়েন্ট সম্পর্কে গভীরভাবে কথা বলতে পারবেন যার ফলে সঠিক চিকিৎসা দ্রুত সম্পন্ন হবে। আপনার চিকিৎসা প্রদানকারী জিজ্ঞাসা করতে পারেন:

  • আপনার উপসর্গ কি এবং কখন শুরু হয়েছিল?
  • আপনার লক্ষণগুলি কি ভাল বা খারাপ হয়েছে?
  • আপনার লক্ষণগুলি কি সংক্ষিপ্তভাবে ভাল হয়ে যায় এবং তারপরে আবার ফিরে আসে?
  • আপনি কি সম্প্রতি বিদেশ ভ্রমণ করেছেন? কোথায়?
  • আপনি কি ভ্রমণের আগে আপনার টিকা দিয়েছেন ?
  • আপনি কি অন্য কোন সমস্যার জন্য চিকিৎসা গ্রহণ করছেন?
  • আপনি কি বর্তমানে কোন ঔষধ গ্রহণ করছেন?

আরো পড়ুন-
টাইফয়েড জ্বরের লক্ষণ: কীভাবে বুঝবেন, কী করবেন?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *